বইয়ের ক্রেতা কমে যাচ্ছে!?

বইয়ের ক্রেতা কমে যাচ্ছে!?
.
‘বইয়ের ক্রেতা কমে যাচ্ছে, লেখার মান নেই, সম্পাদনা হচ্ছে না’ ইত্যাদি কথা বইমেলার আগে শুরু হয়, মেলার শুরুতে এটা বেশ চড়ায় ওঠে এবং মেলা শেষ হতে হতে প্রায় নেই হয়ে যায়। অনেক বছর ধরেই এটা দেখা যায়।

কথাগুলোর মধ্যে হয়তো সত্য আছে। কারণ সমাজের মধ্যে ঘটমান বিষয়ের রেশ সামাজিক প্রতিক্রিয়ায় উঠে আসবে সেটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু বই যদি কেউ না পড়ে, লেখার মান যদি না থাকে, সম্পাদনার যদি ধার না ধারা হয় তাহলে অসুবিধাটা কার এবং কোথায়?
যে-কোনো দেশে বইয়ের ক্রেতা ও ভোক্তাশ্রেণীকে মোটাদাগে ৩টি দলে ভাগ করা যায়। এই ৩ দলের প্রবণতা এবং চরিত্র বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যেতে পারে।

.
প্রথম দল: এই দলে রয়েছে পড়ালেখা জানা মানুষের একটা অংশ, যারা রুটি-রুজির নিশ্চয়তাসহ জীবনযাপনের মান উন্নয়ন, পদমর্যাদা ও সম্মান বৃদ্ধির জন্য বই পড়ে। অর্থাৎ বস্তুগত-অবস্তুগত চাহিদা পূরণের সাথে এই পাঠক-দলের পাঠাভ্যাস বাড়া-কমার একটা সরাসরি বা সমানুপাতিক সম্পর্ক আছে। বইয়ের পাঠক হিসাবে এরা সবদেশেই সবচেয়ে বড় দল, এবং শিক্ষার হার ও মান বৃদ্ধি ও তাদের সেই চাহিদা-পূরণের সম্পর্ক ইতিবাচক থাকলে এই দল বিশাল হয়ে উঠতে পারে।

কিন্তু যদি সম্পর্কটা বিপরীতমূখী বা ব্যস্তানুপাতিক হয়, অর্থাৎ বই না পড়েও যদি এরা তাদের কাক্ষিতটা পেয়ে যায়, এমনকি বই পড়লেই উল্টো যদি তা পাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরী হয়, তবে এই দলের বই পড়া কমে যাবে।

বিভিন্ন প্রকাশিত তথ্য এবং অপ্রকাশিত কর্মকাণ্ডের সামাজিক প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট যে বাংলাদেশে অনেকটা তেমন অবস্থা বিরাজ করছে। বইয়ের মূল্য কমানো, লেখার মান বাড়ানো বা সম্পাদনার সাথে এই দলের সংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধির সম্পর্ক কম। এমন অবস্থায় শিক্ষার হার বাড়িয়েও এই দলের সংখ্যা বাড়ানো যায় না।

.
দ্বিতীয় দল: এই দলে রয়েছে পড়ালেখা জানা মানুষের অতি অল্প একটা অংশ, যারা শুধুই বৈষয়িক উদ্দেশ্যে নয়—সৃষ্টির তাগিদে, জানার জন্য, আত্মার খোরাকের জন্য, মনের বিকাশের জন্য বা বিনোদনের জন্য বই পড়ে। এই দলটি সবদেশেই অতি ক্ষুদ্র, তবে এরা মোটামুটি স্থায়ী। এরা কখনো একেবারে বই পড়া ত্যাগ করবে না।

প্রথম দলের সংখ্যা বৃদ্ধি থেকে দ্বিতীয় দল বংশপরম্পরায় ক্রমশ বাড়তে থাকে, এবং প্রথম দল হ্রাস পেলে এটাও হ্রাস পায়; তবে কখনো নিঃশেষ হয় না। বই যদি কখনো ফর্ম হিসাবে একবারে নেই হয়ে যায় তাহলেও এরা এরকমই ভিন্ন কিছু করবে।

বাংলাদেশে প্রথম দল যেহেতু কমছে সেহেতু দ্বিতীয় দলের উপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং একইসাথে বইয়ের বিভিন্ন বিকল্প তৈরী হওয়ায় এই দল ক্রমশ ছোট হচ্ছে।

.
তৃতীয় দল: এই দলে রয়েছে সরকার, লাইব্রেরী, সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান। এগুলো পাঠক নয়, কিন্তু প্রথম ও দ্বিতীয় দল, বিশেষ করে প্রথম দলের সংখ্যার হ্রাস-বৃদ্ধিতে এবং বই উৎপাদনের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য নির্ধারণে এদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই দলের চরিত্র, ধরণ এবং এদের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গ প্রত্যক্ষভাবে পাঠক, বইয়ের মান এবং কি-ধরণের বই উৎপাদান হবে তার উপর দ্রুত প্রভাব রাখতে পারেন।

বিভিন্ন প্রকাশিত তথ্য এবং অপ্রকাশিত কর্মকাণ্ডের সামাজিক প্রতিক্রিয়া থেকে স্পষ্ট যে ভালো বই ও ভালো পাঠক সৃষ্টিতে এই দলের প্রভাব ক্রমশ নেতিবাচক থেকে চরম নেতিবাচক হয়ে উঠেছে। পাবলিক লাইব্রেরী, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, এনজিও, শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের বিবিধ দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানের গ্রন্থসংগ্রহ থেকে এটা স্পষ্ট।

তবে প্রথম ও দ্বিতীয় দলের সংখ্যা হ্রাস পেলেও বইয়ের বিক্রি কমবে কিনা তা নির্ভর করে মূলত তৃতীয় দলের সিদ্ধান্তের উপর। তাই দেশে মোট বইয়ের বিক্রি কমেনি। আর কমেনি বলেই মূলত প্রকাশক বাড়ছে, বই প্রকাশের সংখ্যাও বাড়ছে।

এতে অসুবিধা অন্তত তৃতীয় দলের হচ্ছে না। কারণ বস্তুগত লাভ ছাড়াও এরা ক্রমশ অজ্ঞতার ফায়দা নিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, অর্থাৎ যতো অশিক্ষা-কুশিক্ষা, তাদের ততো লাভ। এবং এটা ততোদিন পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে যতোদিন অজ্ঞতা-অশিক্ষা-কুশিক্ষা এদের জন্য ব্যুমেরাং না হয়ে উঠবে। (রাখাল রাহা, ২৪শে ফেব্রুয়ারী ২০১৪, পরিমার্জনা: মার্চ ২০২২)

Leave a Reply

Your email address will not be published.