শিক্ষাঙ্গনে শাসন

শিক্ষাঙ্গনে শাসন / রাখাল রাহা
১.
ম্যাডাম না থাকায় একবার আমি শিশুশ্রেণীতে ক্লাস নেওয়ার জন্য ঢুকতেই একটা বাচ্চা বললো, আজ আফায় নাই, হগ্গলে মিইল্যা স্যারেরে ফাগল বানায়া ফালামু!

আমি বাচ্চাটার দিকে তাকালাম। পাঁচ-ছয় বছর বয়স হবে। কেমন সমাজ-পরিবার-শৈশবের মধ্য দিয়ে গেলে একটা শিশু এই বয়সেই এমন ফন্দি আঁটতে পারে!

বহু কষ্টে প্রথম দিন সামাল দিলাম। দ্বিতীয দিনেই বেত ব্যবহার করলাম। স্কুলের প্রধান শিক্ষক থেকে শুরু করে সবাই কাঁপতে লাগলেন। তাদের ভয়, আমার চাকরী চলে যাবে।

(সেটা ছিল আমার প্রথম চাকরী, আর চাকরীটা ছিল শিশুদের বইপুস্তক বা উপকরণ উন্নয়নের কাজ নিয়ে। এর অংশ হিসাবেই আমাকে ছয় মাসের জন্য স্কুল বুঝতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু শ্রেণীশিক্ষক ট্রেনিংয়ে গেলে ক’দিনের জন্য আমাকেই পুরো ক্লাস নিতে হয়। এটা তখনকার অভিজ্ঞতা।)

যাহোক চাকরী নিয়ে আমি অস্থির ছিলাম না, দু’দিনেই ক্লাসে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করলাম। এরপর ম্যাডাম ফিরে এলেন এবং আমি হাঁপ ছাড়লাম।
আমি দেখেছি তিনি কখনো ক্লাসে বেত ব্যবহার করতেন না। বাচ্চাদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে যেতেন, কিন্তু কখনো রূঢ় আচরণও করতেন না। হতে পারে চাকরীর ভয়ে বা বাইরের থেকে আমি আছি বলে। তবে আমার চেয়ে তিনি অনেক সুন্দর ক্লাস পরিচালনা করতেন। বিষয়টা নিয়ে আমি অনেকদিন ভেবেছি।

২.
হাইস্কুল জীবনের শুরুতে আমরা ক’জন মিলে টিফিনের সময় প্রায়ই বাসে চড়ে পাশের বাজারে চলে যেতাম। দলবেঁধে বাসে চড়াটাই ছিল আমাদের জন্য তখন আনন্দের। আর বাজারে সুন্দর নেচে-গেয়ে কি সব বিচিত্র রোগের ওষুধ বিক্রি হতো, সেসব দেখে আবার ফিরে আসতাম। প্রায়ই দেরী হতো এবং স্যার বকা দিতেন। কিন্তু সেদিন সবাইকে এমন মার দিলেন যে এরপর থেকে আমি আর কখনো বাজারমুখো হইনি।

কিন্তু মনে আছে প্রাইমারী স্কুলে পড়ার সময়ের কথা—আমাদের হেডস্যার কখনো মারতেন না। তিনি খুব নবাব সিরাজউদ্দৌলা আর মুসলিম সুফীসাধকদের গল্প বলতে পছন্দ করতেন। এবং যে-বিষয়ের ক্লাসই হোক, গল্প জুড়ে দিতেন। আমরাও খুব মন দিয়ে তাঁর গল্প শুনতাম, আর পড়ায় ফাঁকি দিতাম। কোনো হোমওয়ার্ক করতাম না।

একদিন এমন হলো যে সেদিন কেউই হোমওয়ার্ক করেনি। হেডস্যার তাঁর প্রথা ভেঙে মার শুরু করলেন।

মারের এমন ভয়াবহ তীব্রতা দেখে এক ছাত্র স্কুলের ভাঙা বেড়ার মধ্য দিয়ে মারলো ঝাঁপ।

আমি আজও যেন দেখতে পাই স্কুলের মাঠ ছাড়িয়ে চৈত্র মাসের চাষ করে রাখা ঠনঠনে বড় বড় মাটির ডেলার মধ্য দিয়ে দূরের গ্রামের দিকে সেই ছাত্রের পিছন পিছন দৌড়ে চলেছেন আমাদের হেডস্যার। শেষে ঘামে ভিজে পরাজিত নবাবের মতো চুপচাপ ফিরে তিনি অফিসরুমে ঢুকলেন। কিন্তু সেই ছাত্র আর স্কুলে ফেরেনি। ফিরলে কি লাভ হতো, বা না ফেরায় কতটা ক্ষতি হলো জানি না। কারণ আমরা ৩০-৪০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে এসএসসি পর্যন্ত পৌঁছেছিলাম মাত্র ৩-৪ জন। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি আমি একা। কিন্তু প্রাইমারী শিক্ষার যা কিছু মনে আছে তার মধ্যে রয়েছে হেডস্যারের সেই বই-না-পড়ানো গল্পগুলো।

৩.
শিশু বললেই যে পূতপবিত্র পুষ্পসম রূপটি আমাদের মনে ভেসে ওঠে সে আসলে তা-ই। আর একটা সমাজের রূপ শিশুর আচরণের মধ্যদিয়েই স্পষ্ট হয় অধিক, কারণ সে-ই সবচেয়ে বেশী অনুকরণ করে। তাই অপেক্ষাকৃত সুস্থ সমাজ-পরিবারের একটি শিশু আর অপেক্ষাকৃত অসুস্থ সমাজ-পরিবারের একটি শিশু গড়ে এক নয়। সুতরাং বিদ্যমান সমাজ-রাষ্ট্র-পরিবার থেকে নানা মাত্রার নেতিবাচক আচরণ-দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যখন অনেকগুলো শিশু স্কুলে একত্রিত হয় এবং তাদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত পূর্বতন সমাজ ও মূল্যবোধের ধারক একজন শিক্ষক যখন তাদের মুখোমুখী হন তখন প্রতিনিয়তই সেখানে এক ধরণের চিন্তা-বিশ্বাস-আচরণ-মূল্যবোধের সংঘর্ষ ঘটে চলে। এবং এখানে উভয়েই এক ধরণের কম্প্রোমাইজের মধ্য দিয়ে শিক্ষপ্রদান ও শিক্ষাগ্রহণ কাজ করে চলে।

এখন প্রশ্ন কে কতটা কম্প্রোমাইজ করবে এবং কিসে কার লাভ?

অবশ্যই শিক্ষকই বেশী কম্প্রোমাইজ করবেন, কারণ তিনি শিক্ষক এবং তিনি শিশুর চেয়ে অধিক সমাজটা বোঝেন। চেষ্টা করলে তিনি প্রতিটি শিশুকেও বুঝতে পারেন এবং এটি তার কাজে সফল হওয়ার পূর্বশর্তের মতো।

কিন্তু সমাজ-রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করেন তারা যখন প্রতিনিয়ত এই সমাজটার, এই রাষ্ট্রটার অধঃপতন ঘটিয়ে চলেন আর তার প্রতিফলনে শিশুর আচরণে নেতিবাচক প্রবণতা বেড়ে ওঠে তখন তা শোধনের সকল দায়িত্ব শিক্ষকের উপর ছেড়ে দিয়ে তার থেকে শাসনের দণ্ডটা কেড়ে নিলে সেটা কতটা যৌক্তিক হয় তার বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

উপরন্তু শুধু শিক্ষার্থী নয়, সেই অধঃপতিত সমাজের নিকৃষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই শিক্ষক নামের এই পেশায় ঠাঁই নিয়েছেন যে অগণিত শিক্ষক তাদের সেই অশিক্ষকসুলভ আচরণের দায় কতটা শিক্ষকসমাজের আর কতটা সমাজ-রাষ্ট্রের কর্ণধারদের—এটারও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

৪.
একটা হাইস্কুলের ম্যানেজিং কমিটির দায়িত্ব পালনের সময় একদিন একজন শিক্ষক বললেন, কি করবো বলেন! একটা দুষ্ট ছাত্রের দিকে বেত নিয়ে এগিয়ে গেলে সে খপ করে আমার বেত ধরে বলছে, আমাকে মারলেই কিন্তু স্যার আপনার চাকরি খাবো!

আমরা সবাই জানি, এখন শিক্ষকের চাকরি খাওয়াটা বলতে গেলে ম্যানেজিং কমিটি, মানে স্থানীয় রাজনীতির কাছে তিন দিনের বিষয়ও নয়।
আরেকজন শিক্ষক একদিন বললেন, কি পড়াবো বলেন? একটু ভালোভাবে বোঝাতে গেলেই বলে, স্যার অত টেনশন কইরেন না। এ-প্লাস না পাইলেও এ পামু।

অন্যদিকে একটা ছেলে ও মেয়ের সম্পর্ক নিয়ে স্কুলে কানাঘুঁষা ছড়িয়ে পড়লে অসৎ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পাওয়া একজন ইয়াং টিচার ছেলেটাকে বলেন, তুই ওর সাথে মেশার চেষ্টা করবি না! আমি ওকে বিয়ে করবো!

অথচ লক্ষ্যণীয় যে, যারা শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ, শিক্ষার পরিবেশ, শিশুদের ভবিষ্যৎ এমন ভয়ানকভাবে ধ্বংস করে চলেছে, দেখা যায় তারাই শিশুর জন্য মায়াকান্না কাঁদছে বেশী। আহা, ও শিশু, ও কিছুই বোঝে না! ওকে সবকিছু বলে দাও, হাতে ধরে লিখে দাও, প্রশ্নগুলো দিয়ে দাও, ও ফেল করবে কেন, ও কষ্ট পাবে!

৫.
শিশুদের শাসন বিষয়ে তাহলে আমাদের মতো অরাজক দেশে করণীয় কি? করণীয় যেটাই হোক, আমার ক্ষেত্রে শাসনে লাভ হয়েছে বা অমুকের ক্ষেত্রে শাসনে ক্ষতি হয়েছে, এভাবে সিদ্ধান্ত টানা যাবে না। শাসন বিষয়ে সিদ্ধান্ত টানার জন্য সামগ্রিকভাবে বিষয়টা দেখা দরকার; শিক্ষা-সমাজ-পরিবেশকে বস্তুনিষ্ঠভাবে বিশ্লেষণ করা দরকার।

শারীরিক আঘাত কোনোভাবেই কাম্য নয়, কারণ তা থেকে সৃষ্ট শরীরের ক্ষত সেরে গেলেও মানসিক ক্ষত সারতে অনেক সময় লাগে বা ক্ষেত্রবিশেষে কখনোই সারে না—এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। তাহলে বাবা-মা শাসন করেন কেন? এদেশে এমন বাবা-মা কি আছেন যিনি তার ছেলেমেয়েকে একদিনও মারেননি বা ভয় দেখাননি বা ধমক দেননি? তাহলে এটা ঘটছে কেন?

এর কারণ হচ্ছে কোনো বিশেষ বিষয় থেকে শিশুর মনোযোগ সরিয়ে আমাদের কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে আনতে যতগুলো উপায় আছে তার মধ্যে শাসন, ধমক, ভয় বা আঘাত হচ্ছে সবচেয়ে সহজ একটা উপায়।

সহজটাই সবাই পছন্দ করে, তা খারাপ হলেও। কিন্তু বিকল্প যে উপায় আছে তা বোঝার জন্যও শিক্ষার প্রয়োজন, সুশাসন প্রয়োজন, সুসমাজ প্রয়োজন। সমাজে-রাষ্ট্রে নৈরাজ্য প্রতিষ্ঠা রেখে, দুঃশাসনে নিমজ্জিত রেখে ব্যক্তির কাছ থেকে মানবিক প্রবৃত্তি আশা করলে তা পাওয়া যায় না।
আমাদের অবশ্যই মনে রাখা দরকার শিক্ষকদের শাসন বা মারের বিরুদ্ধে শিক্ষা কর্তৃপক্ষের বর্তমান ‘জেহাদ’ শিক্ষার প্রতি বা শিশুর প্রতি ভালোবাসা থেকে নয়। শিক্ষা নিয়ে, শিশু নিয়ে, স্বাস্থ্য নিয়ে প্রতিদিনের এত বিপর্যয় দেখেও যারা এটা বোঝেন না তাদের জন্য করুণা। (রাখাল রাহা, ২০১৬)

——————
[নোট : প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন-২০১৬ অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের মানসিক নির্যাতন বা শারীরিক শাস্তি দিলে শিক্ষকদের সর্বোচ্চ শাস্তি পঞ্চাশ হাজার টাকা ও তিন মাস কারাদণ্ড।—ধারা ৮/৪, ২৪/২। চূড়ান্ত আইনে কি করা হয়েছে দেখতে হবে।

বস্তুত শিক্ষকেরা শাসন করবে কি না, বা করলে কতটুকু করবে তা জেল-জরিমানা দিয়ে নির্ধারণের বিষয় নয। এটা যোগ্য শিক্ষক যথার্থ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দান, তাদের যথার্থ প্রশিক্ষণ ও মোটিভেশন প্রদান এবং বিদ্যালয় পরিদর্শন ও বিদ্যালয় প্রশাসনের বিষয়।

অসৎ প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত শিক্ষক, ম্যানেজিং কমিটি, দুর্নীতিগ্রস্থ প্রশাসন ও স্থানীয় টাউটদের কর্মকাণ্ডে চরম মানসিক চাপের মধ্যে থেকে থেকে বর্তমানে প্রায় সকল নিবেদিত শিক্ষকই তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য থেকে নিজেদের নীরবে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। যেটুকু আছে এ ধরণের আইনের ফলে সেটুকুও সরে যাবে। কারণ এটা দিয়ে যে কাউকে চাইলে ফাঁসিয়ে দেওয়া যাবে।]

Leave a Reply

Your email address will not be published.