সভ্যতার সংকট ও শিক্ষার দায়

সভ্যতার সংকট ও শিক্ষার দায় / রাখাল রাহা

আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা উল্টোপথে চলছে, আর সেই উল্টোপথকে বলা হচ্ছে শিক্ষাবিজ্ঞান! বিজ্ঞান এখনো পর্যন্ত যেটুকু জানতে পেরেছে তা দিয়ে বলছে, মানুষের মস্তিষ্কের বিকাশ জন্মের পূর্বেই প্রায় সম্পন্ন হয়ে যায়। যেটুকু বাকি থাকে তা জন্ম-পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যেই সম্পূর্ণ হয়ে যায়। এরপরও যদি কিছু বাকি থাকে তা পূর্ণ হতে হতে কয়েক বছরের পর আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না।

বিকাশের ঠিক এরকম পর্যায়ে সাধারণত একটা শিশু স্কুলে আসে। অর্থাৎ একটা শিশু যখন স্কুলে আসে তখন তার মধ্যে সম্ভাবনা সৃষ্টি করিয়ে দেওয়ার কাজ আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। স্কুল বা শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান তাহলে কি করে? যেটা করে তা হলো শিশুকে শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, সামাজিকীকরণ, সাক্ষরতা ইত্যাদির সুযোগ দিয়ে যার যতটুকু সম্ভাবনা আছে সেটারই বিকাশের পথ করে দেয়, অথবা সুযোগ দেওয়ার নামে সম্ভাবনাকে সঙ্কুচিত করে বিকাশের পথটাকে আরো রুদ্ধ করে দেয়। শুধু শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান নয়, পরিবার বা সমাজ বা রাষ্ট্রও বহু ধরণের অভিজ্ঞতা দিয়ে তাকে তার অমিত সম্ভাবনার দিকে চালিত করে বা তার পথ অবরুদ্ধ করে দাঁড়ায়।

তাহলে শিক্ষা কি, শিক্ষার কাজটা কি? একটা বটবৃক্ষের বীজ পুরনো ভাঙা দালানের কোণায় পড়লে তার সকল সম্ভাবনা নিয়েই সেটা যেমন সারাজীবন বামন হয়ে থাকে, আর উপযুক্ত মাটিতে পড়লে ও প্রত্যাশিত আলো-বাতাস পেলে সেই বীজটাই যেমন বিশাল মহীরূহ হয়ে ওঠে, তেমনি শিক্ষা হলো একটা শিশুর জন্য উপযুক্ত মাটি আর আলো-বাতাসের ন্যায়।

সমাজ-পরিবার বা রাষ্ট্রের কাজ হলো তাই বীজ বুঝে তার উপযোগী মাটি তৈরী করে দেওয়া, তার জন্য উপযুক্ত আলো-বাতাসের ব্যবস্থা করা, আর এ থেকে যে লতা-গুল্ম-বৃক্ষ-মহীরূহ তৈরী হলো তার ফুল-ফসলের মর্যাদা নিশ্চিত করা। তাহলে বলা যায় শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান হলো এমন একটা পরিকল্পিত সংগঠন, যেখানে সকল লতা-গুল্ম-বৃক্ষ-মহীরূহের বিকাশের পথ অবারিত থাকে। সুতরাং শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের কাজ এটা নয় যে, সব লতাকে মহীরূহ বানানোর সাধনা করা বা সব মহীরূহকে কেটেছেটে গড় মানে নিয়ে আসা!

কিন্তু বিস্ময়করভাবে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় এমন সৃষ্টি-বিরুদ্ধ প্রবণতা তো রয়েছেই, তদুপরি এখানে এই উপযুক্ত মাটি আর আলো-বাতাস তৈরীর অধিকাংশ প্রযত্ন, শ্রম ও সম্পদ নিবেদিত হয় তাদের জন্য, যাদের সম্ভাবনাই তুলনামূলকভাবে কম। বলা যায়, সম্ভাবনা যেখানে যত কম আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রযত্ন সেখানে তত বেশী। একটা মহৎ উদ্দেশ্য এর পেছনে রয়েছে বলে সামনে যেই ঢোলটা পেটানো হয় তা হচ্ছে—সম্ভাবনার ব্যবধানটা কমিয়ে আনা, যাতে পেছনে যারা রয়েছে তারা সমাজের বোঝা না হয়।

কিন্তু এটা করতে গিয়ে যারা জগতে অসীম সম্ভাবনা ধারণ করে এসেছিল, নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এসেছিল, তাদের প্রতি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এখনো প্রায়, সেভাবে তাকানোরই সময় পায় না! এতে করে শিক্ষা জগতের সমষ্টিগত যতোখানি কল্যাণ সাধন করতে পারতো তার সামান্যই পারে। কারণ মানবশিশুকে বীজ বা গাছের সাথে তুলনা করলেও এ ধরণের তুলনার একটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সীমাবদ্ধতা হলো, একটা গাছের সর্বোচ্চ পুষ্টি নিশ্চিত করলে সে শুধু তার বিকাশই নিশ্চিত করে সর্বোচ্চ ফুল-ফসল দিতে পারে, কিন্তু তার পরিবেশের অন্যান্য বৃক্ষের পরিপুষ্টি সাধনে বা ফুল-ফসল উৎপাদনে খুব সামান্যই ভ‚মিকা রাখতে পারে। কিন্তু মানুষ তা নয়। অসীম সম্ভাবনাময় একজন মানুষই যথাযথ পরিবেশ পেয়ে শুধু মানুষের জগৎ নয়, বস্তু-অবস্তু-প্রাণ-প্রকৃতির পুরো জগৎটাকেই পরিবর্তনের সম্ভাবনার দিকে চালিত করতে পারে।

এই যে ব্যক্তির অমিত বিকাশের সম্ভাবনা—তাকে অধরা রেখে এবং গড় মান বাড়ানোটাকে কেন্দ্রে রেখে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব এতটাই বাড়িয়ে তোলা হয়েছে যে, পরোক্ষভাবে মনে হয় শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের উপরই শিক্ষার্থীর সকল সম্ভাবনা নির্ভর করে, তা তার বীজে সম্ভাবনা যতো ক্ষুদ্রই থাক! তাই জগৎ জুড়ে গোটা শিক্ষাব্যবস্থার কারিকুলাম, পাঠ্যসূচি, পাঠ্যপুস্তক ইত্যাদি সকলকিছু নির্মাণ করা হয় মূলত মাঝারি, এমনকি সম্ভাবনাহীনদের দিকে তাকিয়ে।

জগতে মাঝারিদেরই যেহেতু সংখ্যাধিক্য, আর সম্ভাবনাময়দের সংখ্যা যেহেতু সম্ভাবনাহীনদের চেয়েও বহুগুণ কম থাকে, সে-কারণে শিক্ষা ও কল্যাণ-ভাবনায় মাথাগুনতির যুক্তিকে শিক্ষাবিজ্ঞানে স্থায়ীভাবে তত্ত্বাবদ্ধ ও সূত্রাবদ্ধ করা দারুণভাবে সম্ভব হয়েছে। এটা করার জন্য সহজ, শিশুবান্ধব, মানসিক চাপমুক্ত, সবার সমান সুযোগ ইত্যাদি বহু পরিভাষার সৃষ্টি করা হয়েছে। এতে করে শিক্ষা জগতের যে কল্যাণ সাধন করতে পারতো তার সম্ভাবনা মারাত্মকরকমভাবে কমে গেছে। কিন্তু জগতে একটা শক্তির বিকাশ ঘটে গেছে, যারা এই প্রচেষ্টারই গুণগান এবং তার জন্য জানপ্রাণ দেওয়ার উছিলায় আলাদা এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুত হয়েছে।


সব শিশু সমশিশু নয়। সুতরাং কার জন্য সহজ, কার বান্ধব, কার মানসকে গুরুত্ব দিলে যে উৎকণ্ঠা-তাড়িত হয়ে এমন উল্টোমুখী শিক্ষাব্যবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে তার নিরসন হতে পারতো—তা বোঝা প্রয়োজন। জগতে ভালোর পথটা প্রশস্ত করে দিলে সে-যে অসংখ্য খারাপের দায়িত্ব নিতে পারে, বা তার সৃষ্টিক্ষমতায় সমাজ বা রাষ্ট্র সমৃদ্ধ হয়ে খারাপের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা করতে পারে—এই সত্যটা বোঝা দরকার। প্রাচীন বাঙলায় গুরুদের পাঠশালায় গরুদের দোহাই দিয়ে সম্ভাবনাময়দের পিছিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা ছিলো না।

বরং সর্দার-পোড়ো পার হয়ে পণ্ডিত বা গুরুর কাছে যাওয়ার আগেই অধিকাংশ পোড়োর বিদায় ঘটতো। এখন সর্বজনীনতার যুগ। সমান সুযোগ ইত্যাদির জিগির তুলে সারা দুনিয়াতেই সবাইকে সব অর্জন করিয়ে দেওয়ার সোরগোল। মহত্ব অর্জনের খায়েসে সুযোগের দোহাই, সমতার দোহাই, ইত্যাদি দিয়ে যে যা না-পারে তাকে তাই বানানোর প্রচেষ্টা। আর তার ভীড়ে চাপা দিয়ে-দিয়ে অসীম সম্ভাবনাকে বিবর্ণ করে তোলা!

শিক্ষার এই যে উল্টো প্রচেষ্টা, দেশে দেশে তারও বহু রূপ আছে। প্রায় মেধাহীন, প্রতিবন্ধী, স্লো-লার্নার ইত্যাদি নাম দিয়ে কিছু শিশুকে পৃথক করে এগিয়ে তোলার প্রযত্ন-প্রয়াস যেমন আছে, তার সাথে অতিমেধাবী নাম দিয়ে আবার কিছু শিশুকে ভিন্ন কারিকুলাম, পাঠ্যসূচি ও পাঠ্যবইয়ের আওতায় রাখার উদ্যোগও রয়েছে। একইসাথে তত্ত্ব রয়েছে স্লো-লার্নারদের বন্ধুরাও স্লো-লার্নার হওয়ায় তারা বন্ধুদের কাছ থেকে কিছুই শিখতে পারে না; অ্যাডভান্সড লার্নাররা অ্যাডভান্সড হওয়ায় তারা সমাজের গড় বুঝতে পারে না। উপরন্তু তাদেরকে পৃথক করায় তারা যে আলাদা এটা উপলব্ধি করে উভয় দলই নানা ধরণের মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়। ফলে এ ধরণের পৃথকীকরণে শিক্ষার মাধ্যমে তাদের বিকাশের যেটুকু সুযোগ হতে পারতো সেটাও অনেক ক্ষেত্রে সঙ্কুচিত হচ্ছে। আসলে জগতের বৈচিত্র্যের উপলব্ধি থেকে বিচ্ছিন্ন যে শিক্ষা সে কোনো শিক্ষাই নয়। আর অ্যাডভান্সড বা অতি বুদ্ধাঙ্ক মানেই অতি ভালো বা অতি সৃষ্টিশীল কিছু নয়।

অতি বুদ্ধাঙ্ক আর প্রায়-শূন্য বুদ্ধাঙ্কের মাঝেই রয়েছে অধিকাংশ। অধিকাংশ—এই সাধারণ বুদ্ধাঙ্কদের নিয়ে যে মূলস্রোত এবং তার-যে শিক্ষাকার্যক্রম, সেখানে সৃষ্টিশীল-চিন্তাশীল শিশু বলে কোনো শব্দ নেই। কিন্তু ভালনারেবল, স্লো-লার্নার ইত্যাদি পরিভাষাযুক্ত অসংখ্য শিশু রয়েছে। আর তাদের শিক্ষা দেওয়ার নামে নানা এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য বিশে^র বিভিন্ন দেশে সরকার ও বিভিন্ন ধরণের উন্নয়ন-বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে কাড়াকাড়ি।

কিন্তু জগতে আজ পর্যন্ত প্রায় কোনো নজরুল-রবীন্দ্রনাথ কিংবা নিউটন-আইনষ্টাইন স্কুলে গিয়ে শান্তি পাননি। আজ জগৎ তাঁদের জয়গানে মত্ত, তাঁদের সৃষ্টি-সম্ভোগে বুদ। এতটাই বুদ যে তাঁরা কেন স্কুলে যেতে চাইতেন না, স্কুল কেন তাঁদের ভালো লাগত না, তা খুঁজে দেখার সময়ও তাদের নেই। তাঁরা যদি স্কুলে গিয়ে আনন্দ পেতেন, বিকাশের উপযোগী পরিবেশ পেতেন তাহলে তাঁদের প্রতিভা আরো বিকশিত হতে পারতো—এই যুক্তি যদি শিক্ষাবিজ্ঞানসম্মত না হয় তবে তো স্কুল উঠিয়ে দিলেই ভালো!


দেশভেদে শিক্ষা সমস্যার অনেক মাত্রা রয়েছে। অতীতে শিক্ষা নিয়ে চিন্তা করতো চিন্তাবিদ, সাহিত্যিক, দার্শনিকেরা—এখন করে রাষ্ট্রের ছায়ায় নানা ধরণের কর্পোরেশন ও উন্নয়ন-বাণিজ্যিক সংস্থা। রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা অতীতে জগদ্বিখ্যাত মনীষীদের শিক্ষাভাবনার সন্ধান করতো, এখন তাকিয়ে থাকে বহু ধরণের কর্পোরেশন ও উন্নয়ন-ব্যবসায়ী সংস্থার পাইপলাইনের দিকে। এবং সেই পাইপলাইন থেকে যা কিছু প্রকল্পাকারে নির্গত হয় বিতর্ক অনুষ্ঠানের পূর্বনির্ধারিত পক্ষ-বিপক্ষের মতো করে তারা, ‘‘অত্যন্ত সঙ্গত কারণেই সেই প্রস্তাবের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে” ফেলেন! তাদের এই অবস্থান থাকে মূলত ক্ষমতারক্ষা বা ক্ষুন্নিবৃত্তির স্বার্থে, কিংবা বাধ্য হয়ে।

মন থেকে এগুলো তারা বিশ্বাস করুন বা না-করুন এই তাগিদে তারা বলতে পারেন না, বা করতে পারেন না এমন কোনোকিছু নেই। অথচ শিক্ষাব্যবস্থায় অক্সিজেন আর হাইড্রোজেন মিলালে পানি হবেই এমন কোনো গ্যারাণ্টিযুক্ত প্যাডাগোজি নেই, মেথডোলজি নেই। তবু বহু কিছিমের কর্পোরেশন ও উন্নয়ন-ব্যবসায়ী দুর্বৃত্তরা যখন যে পেডাগোজি হাজির করেন, যে মেথডোলজি গেলান তাকেই এরা সর্বরোগের মহৌষধ মনে করেন!

বোঝা দরকার, একজন যোগ্যতাসম্পন্ন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক বই ছাড়াই শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা দিতে পারেন। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেও যদি একটা শিশু লিখতে-পড়তে না পারে, তার মূল দায় কারিকুলাম বা পাঠ্যপুস্তকের নয়; দায়ী হলো শিক্ষাব্যবস্থা এবং সেই ব্যবস্থার যারা নির্মাতা-কারিগর, তারা।

যদি কোনো শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া ত্রæটিপূর্ণ হয়, অযোগ্যরা শিক্ষক হন, যোগ্যরা ক্লাস পরিচালনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন, যেনতেনভাবে ক্লাস পরিচালনা করলেও যদি সমস্যা না হয়, প্রশিক্ষণের ন্যূনতম মান যদি না থাকে, ক্লাসের বাইরের এলোমেলো কাজকে যদি শিক্ষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ করে তোলা যায়, সরাসরি শিক্ষার্থীদের সাথে ক্লাস ও মিথস্ক্রিয়ার সময় যদি কমিয়ে দেওয়া যায়—তবে কোনো কারিকুলাম বা পাঠ্যপুস্তক দিয়েই শিক্ষার মানের উন্নতি করা যায় না।

কিন্তু শিক্ষা-উন্নয়নব্যবসায়ী চক্রের প্রধান মনোযোগ সেখানে থাকে না—থাকে কারিকুলাম, মূল্যায়ন-পদ্ধতি, কাঠামো, স্তর, ব্যাপ্তি, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ভাঙচুর আর অস্থিরতা রেখে বছর বছর বই নিয়ে জোড়াতালি দেওয়াতে। আর এর মাধ্যমেই প্রকল্পের পর প্রকল্প করে পূর্বের প্রকল্পের ব্যর্থতার মূল্যায়ন করে-করে আরো-আরো প্রকল্প হাজির করে ধারাবাহিকভাবে শিক্ষার নিম্ন, মধ্য ও উচ্চস্তর ধ্বংস করে যাওয়াতে।


শিক্ষা কখনো কখনো একটা সমাজ বা রাষ্ট্রের জন্য দুর্যোগ বা দূষণতুল্যও হতে পারে। কিন্তু তা সত্ত্বেও সেই সমাজ বা রাষ্ট্রের জনমানসে শিক্ষা কখনোই দুর্যোগ বা দূষণতুল্য হবে না। কারণ শিক্ষা হলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী ইতিবাচক প্রপঞ্চ বা ফেনোমেনা। অতীতে মানুষের বহু কাক্সিক্ষত এই প্রপঞ্চ থেকে মানুষকে বঞ্চিত রাখার মাধ্যমে মানুষের ধ্বংসসাধনের পরিকল্পনা করা হতো। বর্তমানে এটাকে সবার জন্য সমান সুযোগ হিসাবে হাজির রাখার মাধ্যমে ধ্বংসের পরিকল্পনা সাজানো হয়।

সবার জন্য কোনো এক ধরণের শিক্ষার বিস্তার ঘটিয়ে যদি তার উপযোগী সামাজিক-অর্থনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিবর্তন না করা হয়, কিংবা যদি পরিকল্পিতভাবে উল্টোটা করে তোলা যায়, তবে পূর্বের অশিক্ষা থেকে সেই সমাজের যতখানি ক্ষতিসাধন করে স্বার্থ হাসিল করা যাচ্ছিল, পরের তথাকথিত শিক্ষা দিয়ে তার থেকে অনেক অনেক বেশী ক্ষতি সাধন যেমন করা যায়, তেমনি বহুগুণ বেশী স্বার্থসিদ্ধি লাভ করাও সম্ভব হয়। শিক্ষা এ পর্যায়ে হয়ে ওঠে শুধুমাত্র সাক্ষরতা বা বড়োজোর পঠনযোগ্যতার প্রতিশব্দ।

এই তথ্য তো সবার জানা যে, পৃথিবীর প্রতি ১০০ জন মানুষের মধ্যে প্রায় ৩ জনের কোনো ঘর নেই, প্রায় ২০ জনের যেটা আছে তা না-থাকার মতোই! প্রতি ১০ জনে ১ জন না-খেয়ে বা ক্ষুধা নিয়ে ঘুমাতে যায়! পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই শতকোটি মানুষের বস্ত্র বা পোশাকের তথ্যও ধারণা করা যায়; ধারণা করা যায় চিকিৎসাসুবিধা প্রাপ্তির বিষয়েও। বাংলাদেশের মতো দেশের কথা চিন্তা করলে এমন মানুষের হার আরো বেশী হবে এবং সংখ্যাটা কয়েক কোটি ছাড়িয়ে যাবে।

যেটুকু পুষ্টি পেলে আর পারিবারিক-সামাজিক বন্ধন নিশ্চিত থাকলে মানুষের ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ, উচিত-অনুচিত বোধ কাজ করে তা কোনো ঘরহীন-ক্ষুধার্ত মানুষের সাধারণত থাকে না। মানুষের বিবেচনাবোধের যে ন্যূনতম মাত্রা বিবেচনায় রেখে রাষ্ট্রের প্রশাসন ও শৃঙ্খলাযন্ত্রের কাঠামো ভাবা হয় তা এখানে অচল। কারণ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের তীব্র সংকট থাকলে মানুষের অপরাধবোধের ধারণা পৃথক হয়। তাই প্রচলিত অপরাধ নিরাময় কর্মসূচীও তাদের ক্ষেত্রে সেভাবে কাজ করে না। এদের উন্নয়নের (!) জন্য বহু ধরণের উন্নয়ন-ব্যবসায়ী চক্র কাজ করে। তাদের কাজের ধরণটা এমন যাতে মনে হয় মানুষের মৌলিক চাহিদাক্রমের শুরুতেই শিক্ষা!

অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসার ন্যূনতম সুবিধাবঞ্চিত এই মানব-কীটগুলোকে তারা শিক্ষার নামে মূল্যবোধহীন কিছু দক্ষতার উন্নয়ন ঘটায়। শিশুবয়স থেকেই সাধারণত এই মানুষগুলো অতি নিম্নমানের কায়িক শ্রমের সাথে যুক্ত থাকে। কিন্তু শিক্ষা নামক দক্ষতা (!) পেয়ে তারা নিম্ন-মধ্যমানের কায়িক শ্রম ও সেবা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। এদের অপরাধ-বিবেচনার বোধ যেহেতু আগে থেকেই ভিন্ন থাকে, সেকারণে কিছু দক্ষতার পাঠ পাওয়ায় তারা সমাজ ও রাষ্ট্রে চালু থাকা উচ্চমানের অপরাধের সাথে নিম্ন-মধ্যস্তরে যোগাযোগের সুযোগ পায়।

এভাবে ক্রমশ তাদের অনেকেই গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রের নিম্ন-মধ্য পর্যায়ে নির্ধারক ভ‚মিকায় দাঁড়িয়ে যায়। এমনকি কখনো কখনো শীর্ষপর্যায়ের সাথেও তারা যোগাযোগ ও সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হয়। আর এভাবে শিক্ষা ব্যাষ্টিক লেভেলে উন্নয়নের মাধ্যমে একটা রাষ্ট্রের সামষ্টিক লেভেলের যতোটুকু ভারসাম্য থাকে তাকে আরো অস্থির করে পুরো সমাজ-রাষ্ট্রকে আরো পতিত করে।

অন্যদিকে একেবারে ঘরহীন বা ক্ষুধার্তদের বাইরের যে জনসমষ্টি—যারা একটা সমাজ বা রাষ্ট্রের অস্তিত্বের জন্য উপযোগী মূল্যবোধ, বিশ্বাস, রীতি, সংস্কার, সংস্কৃতি ইত্যাদি প্রবহমান রাখায় প্রধান ভূমিকা পালন করে—তাদের শিক্ষায় পরিকল্পিত অস্থিরতা সৃষ্টির মাধ্যমে যদি ধারাবাহিকভাবে পতিত করা যায়, তাদের উদ্যোগ-আয়োজনের উপায়কে সীমিত করা যায়, রাষ্ট্রীয় নীতির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগকে সঙ্কুচিত করা যায়, তবে বিশাল একটা বেকার জনগোষ্ঠী সৃষ্টি করা যায়, যারা সমাজের ন্যূনতম ভারসাম্যটুকুও ভেঙে ফেলে সমাজকে পতিত করতে বিশাল ভূমিকা রাখে। এভাবে পরিকল্পিতভাবে শিক্ষাকে একটা সমাজের জন্য দুর্যোগ বা দূষণের মতো করে তোলা যায়, যেটাতে বাংলাদেশের মতো বহু দেশ আজ আক্রান্ত।

৫.
পরিকল্পিতভাবে ঘনিয়ে তোলা শিক্ষাসংকটের বাইরে যেই আধুনিক ও উন্নত শিক্ষা-গবেষণার আমরা ভক্ত, তাকে এক ধরণের নৈর্ব্যক্তিক বা নিরপেক্ষ বা নরম্যাটিভ সত্তায় স্থাপন করে আমরা অধিকাংশ সময় এর দিকে তাকাই এবং গুণগান করি। এখানে মান, আবিষ্কার এবং উদ্ভাবনই মোক্ষ। শিক্ষার এমত সত্তা নির্ধারণের কারণে সেই মোক্ষ অর্জনের নেতিবাচক ভ‚মিকার দায় যখন আমরা তাকে একটুও না দিই, সেটাকে নিয়ে ফেলি রাজনীতি-অর্থনীতির ঘাড়ে সম্পূর্ণত, আর এমন একটা ধারণাগত বাতাবরণ ও তত্ত্ব যখন নির্মাণ হয়ে যায়—তখন মান, আবিষ্কার ও উদ্ভাবনও অনেকখানি ব্যক্তিবিযুক্ত সত্তায় পর্যবসিত হয়; যেন সেও কোনো স্বয়ম্ভু সত্তা, তারও যেন কোনো স্রষ্টা বা পরিচালক বা নিয়ন্ত্রক নেই। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষায় সৃষ্ট জ্ঞান, মান ও উদ্ভাবন স্বয়ং যখন ব্যক্তির সত্তাকে ধারণ করে যেই জগৎ-প্রাণ-প্রকৃতি তার বিরুদ্ধেই প্রয়োগ করা হয়, তখনও এর উদ্ভাবক থাকতে চায় নৈর্ব্যক্তিক—নিমজ্জিত হতে চায় আরো আরো মানে, আরো উদ্ভাবনে!

সে মনে করে এর মাধ্যমেই তার কর্তৃক পয়দাকৃত জ্ঞান, মান ও উদ্ভাবন দ্বারা সৃষ্ট নয়াসংকট তারই কৃত নয়াতর জ্ঞান ও উদ্ভাবনের মাধ্যমেই ক্রমাগতভাবে দূর হতে থাকবে! এটাকেই সে মনে করে জগতে তার ও তার প্রজাতির স্বাভাবিক এবং অনিবার্য সারভাইবাল প্রসেস! এভাবে জ্ঞান, মান ও উদ্ভাবনও হয়ে পড়ে একটা চক্র বা দুষ্টচক্র, যে চক্র সারা জগতের জ্ঞান আহরণের মাধ্যমে জগতের সর্বনাশ প্রতিরোধের লক্ষ্যে জগৎকে আরো আরো মান ও উদ্ভাবন সৃষ্টির দিকেই ক্রমাগত প্রলুব্ধ ও চালিত করতে থাকে এবং এভাবে আরো সম্মিলিত সর্বনাশের দিকে ধাবিত হতে থাকে।

তার এই চলমানতা যে আগের চেয়েও ক্রমাগত সামষ্টিক বিপর্যয় আর সংকটের দিকে—সেটা নির্ণয় করাও, এমনকি ভবিষ্যতদ্বাণী করাও তখন তার কাছে এক বৃহৎ উদ্ভাবন, জ্ঞান, মান ও সাধনার নাম! অনিবার্যভাবে এই চক্রের নিয়ন্ত্রণ থাকে পৃথিবীর গুটিকয় দেশের হাতে, এবং আরো সুনির্দিষ্টভাবে বললে গুটিকয় রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক মোড়লের হাতে, যারা কিনা আবার এই শিক্ষারই উৎপাদ বা আউটপুট! কিন্তু শিক্ষা ও জ্ঞানতত্ত্ব এমনভাবে নির্মাণ করা হয় যেন তারা কোনো শিক্ষার উত্তরাধিকার কখনো বহন করে আসেননি! যেন তারা এমন এক সত্তা, যার অর্থনীতি-রাজনীতি ছাড়া আর কোনো ব্যাখ্যা নেই!

এভাবে পৃথিবীর শিক্ষাদুর্যোগগ্রস্ত মানুষের কাছে এই দেশগুলো থাকে মোক্ষ এবং সারা জগতের সম্ভাবনাবনময় সকল বীজ এবং তা থেকে সৃষ্ট লতা-গুল্ম-বৃক্ষ-মহীরূহের অনিবার্য গন্তব্য হয়ে ওঠে তারা। তারা সত্য ভালোবেসে, বস্তু-ধারণা-প্রাণ-প্রকৃতিকে ভালোবেসে কেন্দ্র থেকে প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে সকল জ্ঞান মান বজায় রেখে অর্জন করে-করে অনিবার্যভাবে একমুখী প্রবাহ তৈরী করে।

জগৎসভায় তারা পুরস্কৃত হয়, দৃষ্টান্ত হয়, তাদের জ্ঞানের সকল তথ্য সংরক্ষণ হয়। কিন্তু তাদের সকল জ্ঞানের সম্মিলিত গতিপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের ভার যখন গিয়ে পড়ে উপরোক্ত চক্রের হাতে, তখনও তারা তার দিকে তাকানোও তাদের কাজ বলে মনে করে না। এ পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র কেন্দ্রের বাইরে বিশাল প্রান্তের মাটি, প্রান্তের বাতাস, প্রান্তের প্রাণ-প্রকৃতির মাঝ দিয়ে যে জ্ঞান আহরিত হয় সেই জ্ঞানই হয়ে ওঠে প্রান্তের সেই জ্ঞানক্ষেত্র ধ্বংসের হাতিয়ার! এভাবে পুরো পৃথিবী নৈর্ব্যক্তিক ও বিমূর্ত জ্ঞান-মানের উৎকর্ষতা অর্জনের ধারাবাহিকতা নিয়ে যেতে থাকে চরম মূর্ত ধ্বংসের কিনারের দিকে।


আধুনিক শিক্ষাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট হবে যে, কোনো শিক্ষাদর্শন বা লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নয়, একটা চরম কাক্সিক্ষত প্রতিপাদ্যকে প্রাণকেন্দ্রে রেখে এর সকল আয়োজন সাজানো হয়েছে। এটা হলো—মানুষ জানে এবং মানুষ পারে। আর এই জানা ও পারার বোধ জগৎ জুড়ে সকল শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে এমনভাবে চারিত করা হয়েছে, এবং যার ফলে এমন একটা বাতাবরণ শিক্ষাজগতে ছড়িয়ে আছে তা হলো, মানুষ সবই জানে বা সবই পারে! এই উদ্ধত প্রতিপাদ্য এবং তার দ্বারা সৃষ্ট বোধ ও নির্মিত সমাজই সভ্যতার সংকটের মূলে।

সত্য হচ্ছে মানুষ ইতিমধ্যে যতোটা জেনেছে বা পেরেছে তা দিয়েই বুঝেছে যে, জগতে যতো জানা বা পারা যায় ততোই না-জানা বা না-পারার পরিমাণটা বাড়তে থাকে। কারণ নতুন নতুন জানা বা পারার মাধ্যমে তার সামনে আরো বহুগুণ না-জানা বা না-পারার বিষয়টা উদ্ঘাটিত হতে থাকে। কিন্তু এই বিশাল সত্যের প্রকাশ জগতের কোনো আধুনিক শিক্ষা-আয়োজনের মধ্যে এতটুকুও স্পষ্ট নয়, বরং ঠিক তার উল্টো প্রাণপ্রবাহ চরমভাবে চলমান। ফলে মানুষের সকল শিক্ষা, সকল মান, সকল বিজ্ঞান, সকল উদ্ভাবনের সামষ্টিক সৃজনফল শেষাবধি দানবীয় এক ঔদ্ধত্য, যার মাধ্যমে পৃথিবী নামক তার একমাত্র বাসোপযোগী গ্রহটাকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়া।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, মানুষ শিক্ষার প্রাণে এমন প্রতিপাদ্য নির্মাণ করলো কেমন করে? বর্তমানে সভ্যতার এই ভয়াবহ সংকট, বস্তুত শিক্ষারই সংকট—সে বিবেচনা থেকে প্রশ্নটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকৃতপক্ষে মানুষ পারে—এই প্রতিপাদ্যের ঠিক বিপরীত প্রতিপাদ্য ছিল, মানুষ পারে না। এই বিপরীত প্রতিপাদ্যকে প্রাণকেন্দ্রে রেখে অতীতে যে শিক্ষা-আয়োজন সাজানো ছিল তার উৎস ছিল মূলত ধর্ম, রীতি ও সংস্কার। মানুষের সমাজকে এই শিক্ষা একটা পর্যায় পর্যন্ত এগিয়ে দিলেও শেষাবধি এর অবস্থান এমন হয়েছে যে, মানুষের কোনো পারা বা কোনো জানাটাকেই সে সহজভাবে গ্রহণ করেনি, বরং দীর্ঘকাল ধরে তার প্রতি ভয়াবহ বর্বর আচরণ করেছে। এভাবে না-পারার শিক্ষা মানুষের জন্য এমন দানবীয় শিকলতুল্য হয়েছে যে, আর সেই শিকল মানুষকে এতো ভুগিয়েছে এতো পিছিয়েছে যে, বহু ত্যাগের বিনিময়ে সেই শিকল যখন সে ছিঁড়েছে তখন ঠিক তার বিপরীত প্রতিপাদ্যে গিয়ে হাজির হয়েছে যে, মানুষ সবই পারে, সবই জানে। মানুষের এ এক নিরন্তর ট্র্যাজেডী!

বস্তুত আমি কিছুই জানি না, কিছুই পারি না—এই বোধ ছিল মানবসত্তার জন্য ভয়াবহরকমভাবে অবমাননাকর। এই বোধ মানুষকে প্রকৃতপক্ষে এক ধরণের জড়ে পরিণত করে। অন্যদিকে আমি সব পারি, সব জানি—এই বোধের মনোস্তাত্ত্বিক পরিণতি শেষাবধি ঔদ্ধত্য এবং এটা অনিবার্য। এই বোধ সত্যও নয়, সার্থকও নয়। প্রকৃতপক্ষে আমি যতো পারি আমার না-পারার পরিমাণ ততো বাড়তে থাকে—এটাই সত্য। আর এই বোধই আমাকে সংযত করতে পারে। এটা মনোস্তত্ত্বের বিষয়, রাজনীতি-অর্থনীতি বা পুঁজিবাদ-সাম্যবাদের বিষয় নয়। শিক্ষার প্রাণকেন্দ্রের প্রতিপাদ্য এই মনোস্তত্ত্বের ভিত্তিতে নির্মাণ আজ মানব সভ্যতা রক্ষায় জরুরী।

[সংশোধিত ও পরিমার্জিত প্রকাশ, এপ্রিল ২০২২]

——————
ইতিবাচক প্রপঞ্চ : একটা বিশেষ সময়ে মানুষ হিসাবে আমাদের যা কিছু আবশ্যকীয় চাহিদা থাকে এবং বিশেষ কিছুর প্রতি আগ্রহ বা ভালোলাগা তৈরী হয়, খেয়াল করলে দেখা যাবে, সেগুলোর ক্ষেত্রে একটা সাধারণ ঐক্যও তৈরী হয়। এরকম সাধারণ ঐক্য তৈরী হওয়া কোনো বস্তুগত বা অবস্তুগত চাহিদা কিংবা আকাক্সক্ষা বা ভালোলাগা নিয়ে যখন কোনো সমাজ বা রাষ্ট্র তার প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী গ্রহণ করে তখনই সেগুলো হয়ে ওঠে সেই বিশেষ সময়ের সেই সমাজ বা রাষ্ট্রের ইতিবাচক প্রপঞ্চ।

চাহিদার বিষয় হিসাবে শিক্ষা যে-কোনো সমাজে অন্যতম কাক্সিক্ষত প্রপঞ্চ। এটা শুধু চাহিদা নয়, এর প্রতি মানব সমাজের রয়েছে দীর্ঘকালের শ্রদ্ধা ও ভক্তি। পাশাপাশি শিক্ষার শক্তি প্রচলিত মূল্যবোধে ধাক্কা দেয় বলে এর প্রতি সমাজের নানা স্তরে কমবেশী ভীতিও কাজ করে। কিন্তু সার্বিকভাবে এটা হলো সেই প্রপঞ্চ, যার প্রতি ভয় থেকে কেউ বিরোধীতা করলেও তার জন্য সামাজিক-সামষ্টিক নেতিবাচক দৃষ্টি অজান্তে তাদেরকেই ভিতর থেকে দুর্বল করে তুলতে থাকে। ফলে অনেকসময় শিক্ষা বিস্তার হয়ে পড়ে সমাজের অন্য সকল ইতিবাচক প্রপঞ্চের বিস্তার থেকে বিচ্ছিন্ন এবং এককভাবে কর্তৃত্বপরায়ণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published.