আমাদের সব বাদ-ই শেষাবধি মৌলবাদ কেন?

এদেশে শিক্ষিত শ্রেণীর হাতে পড়ে যে কোনো বিশ্বাস বা ধারণা বা তন্ত্র বা বাদ-ই শেষ পর্যন্ত গিয়ে এক ধরণের বিকৃতি বা মৌলবাদে পর্যবসিত হয় কেন?

ধরা যাক, নারীবাদের কথা। নারীর প্রতি সহিংসার ধরণ, চরিত্র, সমাজতত্ত্ব ও মনোস্তত্ত্ব যে পুরুষের প্রতি সহিংসতা থেকে আলাদা, তা বুঝে সমাজ, রাষ্ট্র ও বিশ্বাস-সংস্কারের পুনর্নিমাণের প্রয়োজনীয়তা থেকে যার সৃষ্টি, শেষ পর্যন্ত সেটা হয়ে ওঠে নারী হিসাবে তার নিজের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি-প্রকৃতিবিরোধী এক অবস্থান, যেখানে পুরুষ-নারী যেন পাশাপাশি অভিন্ন প্রাজাতিক বৈশিষ্ট্যে নয়, অনেকটা যেন দাঁড়িয়ে পড়ে শাপ আর নেউলের বিবর্তনিক বৈশিষ্ট্যে!

ধরা যাক, সমাজতন্ত্রের কথা। শ্রমশোষণের মাধ্যমে দানব হয়ে ওঠা পুঁজির হাত থেকে মানুষ-প্রাণ-প্রকৃতিকে রক্ষার যে আলাপ তা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পর্যবসিত হয় উদ্যোক্তা-উৎপাদক মানেই শোষক, আর শোষক মাত্রই ধর্মাশ্রয়ী, সুতরাং শোষক ও ধর্ম দুটোই পরিত্যাজ্য। ধর্মের মতোই কথার প্রতিবাদ কথাতে নয়, লেখার জবাব লেখায় নয়, অনেকসময় খতম বা কতল বা জিহাদ হয়ে ওঠে।

ধরা যাক, পরিবেশ আন্দোলনের কথা। এই আন্দোলনের ধরণ এবং অনেকের কথা শুনে মনেহয় যেন গাছ কাটাই যাবে না! অথচ হওয়ার কথা ছিল—গাছই কাটতে হবে এবং গাছ দিয়েই যা কিছু সম্ভব তা করতে হবে। কারণ গাছের বিকল্প হিসাবে যা ব্যবহার করা হবে শেষ পর্যন্ত গিয়ে তা গাছেরই ক্ষতি করবে। তাই পরিকল্পিতভাবে বনায়ন ও বৃক্ষরোপন করতে হবে এবং মাটি-পানির সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে হবে।

কিংবা বিজ্ঞানের কথাই ধরা যাক। মানুষের বহু শতাব্দীর বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা আর উপলব্ধি থেকে যুক্তিনিষ্ঠভাবে কার্যকারণ খোঁজার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা-ই যে আধুনিক বিজ্ঞান, আর সে-কারণে বিজ্ঞানের কাছে এগুলো যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ, অথচ এখানে বিজ্ঞানপন্থী হওয়া মানেই মানুষের সকল অভিজ্ঞতা-উপলব্ধিগুলোকে যাচাই-বাছাই ছাড়াই পরিত্যাগ করা! বিজ্ঞানের মহারথীরা যতোই বলুন, তারা এখনও জ্ঞানসাগরের তীরে নুড়ি কুড়াচ্ছেন, কিন্তু এখানকার বিজ্ঞানপন্থীদের কথা শুনলে মনে হয় যেন তারা সব আস্ত-আস্ত হিমালয় কোচড়ে নিয়ে ঘুরে বেড়ান!

ধরা যাক কোনো বিশ্বাস বা ধর্মের কথা। মানুষের আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসার শেষ আশ্রয় হিসাবে যার প্রয়োজন এতোখানি, শিক্ষিতের কাছে সে-ই হয়ে ওঠে অনেকসময় মানুষের জীবনাত্মা সংহারে সবচেয়ে বড়ো প্রেরণার নাম! অথচ অশিক্ষিত-সাধারণেরা গাঁ-গেরামে আজও এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাস নিয়ে নেচে-গেয়ে কত লড়াই করে!

ধরা যাক, অবিশ্বাস বা নাস্তিক্যের কথা! মূলত মানুষ-প্রাণ-প্রকৃতির প্রতি জগতে এতো নির্মমতার যৌক্তিক ব্যাখ্যা না পেয়ে যার সৃষ্টি, সে নিজেই হয়ে ওঠে মানুষ-প্রাণ-প্রকৃতি সংহারি চরিত্রসম্পন্ন এক বিশ্বাসের নাম—যে বিশ্বাস অপর বিশ্বাসের মতোই ভিন্ন বিশ্বাসকে ব্যঙ্গযোগ্য, তুচ্ছযোগ্য এমনকি ধ্বংসযোগ্য মনে করে!

কিংবা ধরা যাক ভাষা বা বানান সংস্কারের কথা। শিক্ষা বিস্তার, জাতি গঠন, যোগাযোগের সুবিধা থেকে যার প্রয়োজনীয়তা, শেষাবধি তা “প্রবহমান নদীর মতোর” আপ্তবাণীর স্রোতের তোড়ে যা-কিছু আমার ভাষার তার সবই খারাপ, সবই পরিত্যাজ্যতে গিয়ে পর্যবসিত হয় অনেকটা! বোঝার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলে ভাষার বিজ্ঞান, ভাষার সমাজতত্ত্ব আর ভাষীর মনোস্তত্ত্ব। যে করে ভাষা ব্যবহার, যেন তারই ভাষা নিয়ে যা-খুশী করার অধিকার!

এরকম অনেক কিছু বলা যায়। কিন্তু কেন এমন হয়? এর কারণ খুঁজতে-বুঝতে পলাশী-পূর্ব সমাজ-সংস্কৃতি-ইতিহাস-নৃতত্ত্বের অনুসন্ধান দরকার। পাশাপাশি পলাশী-উত্তর শাসন-শিক্ষা-সংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় এখানকার মনন-চিন্তনের মোল্ডিং-ফোল্ডিং-টাও বোঝা দরকার। বিশেষ করে স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণের নামে উনিশশো একাত্তরের পর যে রাষ্ট্রকাঠামো বানিয়ে আমরা গত পঞ্চাশ বছর কসরত করলাম তার নাড়ীনক্ষত্র একটু নেড়েচেড়ে দেখা দরকার।

এসব সত্ত্বেও এখনও কোনো অজ পাড়াগাঁয়ে যেখানে শিক্ষিতের এতোসব তর্ক গিয়ে পৌঁছেনি, সেখানে হয়তো কোনো মানববৃক্ষের সন্ধান পাওয়া যাবে, যাকে এতোকিছু ছাড়াই অনেক আধুনিক ও মানবিক মনে হবে।

(রাখাল রাহা, জুন ২০২০)

—————–
নোট : এ ধরণের সকল বাদ-ই শেষাবধি জুলুমের হাতিয়ার হয় কিংবা শাসকের পারপাস সার্ভ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published.