সায়েদুল আরেফিন ঃ তথাকথিত অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটি বাতিল, আহবায়ক কমিটি গঠন নিয়ে নানা নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে। হেফাজতে ইসলামের গঠনতন্ত্রকে বাইপাস করে ফেসবুক লাইভে এসে তাঁর ভাষায় কয়েকজন নেতার পরামর্শে বাবুনগরী হেফাজতের কেন্দ্রীয় কমিটি বাতিল করে। পরে শোনা যায় উনি মহানগর কমিটিও বাতিল করেছে। কমিটি বাতিলের পরে ৩ সদস্যের আহবায়ক কমিটি গঠন করার কথা বললেও পরে তা ৫ সদস্যর হয় যাতে আগের মতোই আল্লামা শফীর অনুসারীদের বাদ রাখা হয়। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের অফিশিয়াল ওয়েব সাইট সম্ভবত বন্ধ রাখা হয়েছে তাই সেখান থকে কমিটি বাতিল ও আহবায়ক কমিটি গঠনের সাংগঠনিক প্রক্রিয়া জানা যায় নি। তবে এটা ঠিক যে, যে প্রক্রিয়ায় বাবুনগরী সাহেব এটা করেছেন তা সঠিক নয় বলেই ধরে নেওয়া যায়। কারণ এর আগের অমিটি গঠনেও তিনি সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুসরণ করেন নি।

কেন বাবুনগরী সাহেব তড়িঘড়ি কমিটি বাতিল করে নিজের পছন্দ মত আহবায়ক কমিটি করলেন! তার সম্ভাব্য উত্তর অনেক কিছুই হতে পারে। উনি হয়তো দলের স্বচ্ছ ইমেজের বড় বড় নেতাদের গণ-পদত্যাগ ঠেকানোর কৌশল হিসেবে এটা করেছেন যাতে হেফাজতের ইমেজ একেবারে শেষ না হয়ে যায়। অনেকে বলছেন যে, তাণ্ডবের ও নাশকতা বা ষড়যন্ত্রর দায়ে এখন যারা গ্রেফতার হবে তাদের দায় আগামীতে হেফাজত এড়িয়ে যেতে পারবে, কারণ কোন কমিটি নেই। কিন্তু বিগত কেন্দ্রীয় কমিটির ১৫১ সদস্যের ৮৫ জনের রাজনৈতিক পরিচয় প্রমাণসহ প্রকাশ হয়ে গেছে। তাই এই কমিটি বিলুপ্তির ঘোষণার মাধ্যমে তারা নিরাপদে গা ঢাকা দিতে সুযোগ পাবেন!

এটা যে পুরাতন জামায়াতি কৌশল তা অভিজ্ঞদের কাছে প্রমাণিত। কারণ হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশের সর্বস্তরের কমিটিতে ৩০ ভাগ জামায়াত, ৩০ ভাগ আফগান ফেরত তালেবান যোদ্ধা, বাকী ৪০ ভাগ অন্যান্য দল ও গ্রুপের তথাকথিত ইসলামী নেতা ছিলেন। তাই এটা বাস্তবে জামায়াতে ইসলামী বা ইসলামী জঙ্গিদের সহযোগী সংগঠন হিসেবেই কাজ করছিল। একই কৌশল জামায়াত নিয়েছিল ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৮ ধারা অনুসারে নিষিদ্ধ হলে। তাদের ছাত্রফ্রন্ট সে সময় জাসদের ছাত্র-সংগঠনের ভিতর আশ্রয় নিয়ে দেশজুড়ে নাশকতায় লিপ্ত হয়। তাদের ছাত্র সংগঠন “ইসলামী ছাত্র সংঘ”, ও “ইসলামী ছাত্রী সংঘ” এর সদস্যরা পিঠ বাঁচাতে বাংলাদেশ ছাত্র লীগ (জাসদ)এ ঢুকে সরকারের ইমেজ নষ্ট করতে আদিষ্ট হয়ে এই কাজ করে। পরে অবস্থা অনুকূল হলে “ইসলামী ছাত্র সংঘ” নাম পরিবর্তন করে “বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্র শিবির” নাম নিয়ে ১৯৭৭ সালের ৬ই ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে নিজেদের আত্মপ্রকাশ করে।

সে সময় জামায়াত পুরোটায় ঢুকে পড়ে সাবেক জামায়াত নেতা মওলানা আব্দুর রহীমের নেতৃত্বাধীন ইসলামিক ডেমোক্র্যাটিক লীগ (আই.ডি.এল) নামের রাজনৈতিক দলে, তারা সেখান থেকে নির্বাচনেও অংশ নেয়। পরে জিয়া সরকারের অনুমতি নিয়ে ১৯৭৯ সালে জামায়াতে ইসলামী, বাংলাদেশ নামে আত্ম প্রকাশ করে।

আবার, “নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০০৮” ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে দুটি প্রধান জোট আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টিসহ চৌদ্দদলীয় মহাজোট, বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী সহ চারদলীয় জোট গঠন করে নির্বাচন করে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে নির্বাচনী অঙ্গীকার মত ১৯৭১ সালে মানবতা-বিরোধী অপরাধীদের বিচার শুরু করে। আদালতের বিচারে জামায়াতের মধ্যে থাকা মানবতা-বিরোধী অপরাধী জামায়াত নেতার ফাঁসি শুরু হলে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের রাজনীতির ডিপ ফ্রিজে ঢুকে যায়। এবং পুরাতন কৌশলে তদের ২য় ও ৩য় শ্রেণীর নেতাদের দিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ছোট ছোট ইসলামিক রাজনৈতিক দল গঠন আর সরকারকে বোকা বানাতে হেফাজত ইসলামের কমিটির বিভিন্ন স্তরে ঢুকে পড়ে। ১৯৭৩ সালে পাকিস্তানে গিয়ে পাকিস্তান থেকে লেখাপড়া করা আলেম পাকিস্তানপন্থী বাবু নগরীর মাধ্যমে আল্লামা শফীকে সামনে রেখে জামায়াত শিবির স্টাইলে ২০১০ সালে ১৯ জানুয়ারি জামায়াতে ইসলামীর পরিকল্পনায় হেফাজত ইসলাম নামের একটি অরাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করে, যা বাস্তবে বাংলাদেশ বিরোধী তথা জামায়াতের সহযোগী সংগঠন। হেফাজতকে দিয়ে জামায়াত তাদের প্রথম এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে ২০১৩ সালে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকার জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১ প্রণয়নের বিরুদ্ধে শক্তি প্রদর্শন করে সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে ৫ মে ২০১৩ সালে ঢাকায় সমাবেশের নামে ভয়াবহ তাণ্ডব চালিয়ে।

গত ২৬ ও ২৭ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখেও জামায়াত-বিএনপি বাংলাদেশ বিরোধী কিছু দেশ ও সন্ত্রাসী সংগঠনের আর্থিক সহায়তা ও পরামর্শে সারাদেশে হেফাজতের ব্যানারে চালায় ভয়াবহ তাণ্ডব। যাতে ঝরে পড়ে বহু নিরীহ প্রাণ, কিন্তু এবারেও হেফাজতের ঘাড়ে ভর করে জামায়াত-বিএনপি সরকার উৎখাতে বিফল হয়। গ্রেফতার হওয়া হেফাজত নেতাদের স্বীকারোক্তিমুলক জবানবন্দিতে ভয়াবহ এ সব তথ্য বেরিয় আসছে। তারা বাংলাদেশকে একটি তালেবান স্টাইলের রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় এটা করে বলেও স্বীকার করে।

নিরাপত্তা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, সারা দেশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে তাদের চূড়ান্ত সহিংসতার আগের শেষ ছদ্মবেশে হিসেবে তারা নতুন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জঙ্গি গোষ্ঠী তৈরি করবে। হুজি- হিজবুত- আনসারুল্লাহ- জেএমবিতে নানা নামে ভাগ হয়ে থাকবে তারা। সময় সুযোগ করে সবাই মিলে একসাথে তালেবানি সহিংস প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুবিধার্থে কৌশল হিসেবে হেফাজত কমিটি বাতিল করেছে। আনুষ্ঠানিক কমিটি না রেখে এখন অঞ্চলভেদে মিশন সেট করবে তারা। তাহলে কেন্দ্রীয়ভাবে কাউকে ধরার সুযোগ থাকবে না। ইউনিট হবে অনেকগুলো। জঙ্গিবাদী কার্যক্রম চালাতে সুবিধা হবে কেন্দ্রের ছোট্ট দল দিয়ে, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য কঠিন হবে এদের ওপর নজরদারি চালানো বলে তারা ভাবছেন।

ইংল্যাণ্ড ও পাকিস্তানি অর্থ ও পরামর্শে বাবু নগরীর নতুন এই নোংরা রাজনৈতিক খেলা কীভাবে সরকার মোকাবিলা করবে তা এখন দেখার বিষয়। শেখ হাসিনার ডিজিটাল বাংলাদেশে তথ্য গোপন করে সন্ত্রাসী কাজ আগেও সফল হয়নি, সম্ভব হয় নি, তাই তাদের পরিচয় বেরিয়ে পড়েছে; এবারেও কুচক্রী দেশবিরোধীরা সফল হব না। তবে বিলেত আর পাকিস্তানী টাকা, মাদ্রাসার নিরীহ গরীব ছেলে-মেয়েদের হুর গেলমান হিসেবে ভোগের লালসা তাদের নতুন করে শক্তি সঞ্চয়ের মাধ্যমে সরকারকে উৎখাত করে বাংলাদেশকে তালেবানী রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠায় উৎসাহিত করবে তাতে সন্দেহ নাই। মানে হেফাজতে ইসলাম, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটি বাতিল, আহবায়ক কমিটি গঠন নিয়ে ‘চলিতেছে সার্কাস’ টাইপের ঘটনা।

সোর্স: বাংলা ইনসাইডার

By BD News