অনির্বাচিত এই সরকারের প্রধান সমর্থক দেশটি ভারত!

এখন প্রায় সোয়া কোটি বাংলাদেশী সারা বছর পরের দেশে কাজ করে যে সোয়া লক্ষ কোটি টাকা আয় করে, তার প্রায় তিনভাগের একভাগই এদেশ থেকে নিয়ে যায় মাত্র সোয়া দুই লাখ বিদেশী এক্সিকিউটিভ। আর এই এক্সিকিউটিভদের মধ্যে প্রায় বারো আনাই প্রতিবেশী দেশ ভারতের।
এদেশের সাধারণের সন্তানের শিক্ষাধ্বংসে শাসকশ্রেণীর অনমনীয় অবস্থানের পেছনে এর যোগসূত্র থাকা অসম্ভব নয়। আর কে না জানে, শাসকশ্রেণীর যে-অংশটি বর্তমান রাষ্ট্রক্ষমতায় তারা অনির্বাচিত এবং অনির্বাচিত এই সরকারের প্রধান সমর্থক দেশটি ভারত!

ভারতকে যারা শুধুই বিদ্যাসাগর-রবীন্দ্রনাথ বা মান্না-হেমন্তের দেশ, কিংবা একাত্তরে এক কোটি শরণার্থীর খাওন-দাওন দেওয়া বুঝে এর পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণ করে দেন এবং তার পক্ষ নিয়ে সময়ে তেড়ে আসেন, তাদের জন্য করুণা। মনে রাখা দরকার, যে-বিশ্বব্যবস্থার অংশ আমরা, তার পররাষ্ট্রনীতিতে চিরবন্ধু-চিরশত্রু বা অবৈধ-অন্যায় বা বর্বরতা বলে কিছু নেই, নেই অমানবিক বলে কোনো কিছু।

আমাদের ব্যুরোক্রেসীকে প্রতিবন্ধী কেরানীতে রূপান্তর করা, প্রতিরক্ষা-বাহিনীকে ইট-বালু-সিমেন্ট আর আটা-ময়দা-সুজির ব্যবসার মুনাফায় ঢুকিয়ে দেওয়া, শিল্পপতি-ব্যবসায়ীদের পুঁজি বিনিয়োগের পরিবেশ নষ্ট করে লুটপাট আর পাচারে উৎসাহিত করা, আইন-বিচার-প্রশাসন-স্বাস্থ্য-যোগাযোগ অকার্যকর করা, সংখ্যাগুরুর ধর্মের মানুষকে বিপথে পরিচালনা করা—এসবের সবকিছু সম্ভব, এবং এগুলো করে পার পাওয়াও সম্ভব কেবলই শিক্ষা ধ্বংস করে। এবং এটা মনে করার যথেষ্ট যুক্তি আছে যে, শাসকশ্রেণী তার ১ ভাগের স্বার্থে আমাদের ৯৯ ভাগের শিক্ষাকে এ কারণেই ধ্বংস করছে।

এমন পরিস্থিতিতে কথা বলে, লিখে, সেমিনার করে খুব একটা কিছু হওয়ার সুযোগ নেই। কোনো শিক্ষা ও শিশু রক্ষা আন্দোলনের পক্ষেই একটু চিৎকার করা ছাড়া কিছু করা আজ প্রায় অসম্ভব। পরিস্থিতি এমন যে, আজ যদি আপনি ‘থুথু ফেলা খারাপ, থুথু ফেলা খারাপ’ বলতে থাকেন, দেখবেন এই রাষ্ট্রে আপনি থুথু ফেলা বিষয়ে স্পোকসম্যান হয়ে গেছেন! এমনকি রাষ্ট্রীয় পদকও পেয়ে যেতে পারেন! কিন্তু তাতে রাস্তায় থুথু ফেলার হেরফের খুব একটা হবে না।

এটাই চরম রাজনৈতিক সংকটের কাল। আপনি যাতে হাত দেবেন, দেখবেন তার সমাধান সেখানে নেই। রাস্তার একটা ভিক্ষুককে তার জায়গা থেকে একটু সরাতে যান, দেখবেন ক্ষমতার সর্বোচ্চ শিখর কেঁপে উঠছে। এমত পরিস্থিতিতে নিজে পরিবর্তন হলেই সবকিছুর পরিবর্তন হয় না। আর মানুষ এখনও এমন প্রাণীই, যে আসলে সুশাসনে মানুষ। সকল দেশ, সকল জাতির জন্য তা প্রায় একই মাত্রায় সত্য।

তাই আজ যে ধ্বংস-পরিকল্পনা মধুরতম চেতনার আবরণে শাসকশ্রেণী বাস্তবায়ন করছে তার মধু-গীত-ছন্দে যারা গলা মিলিয়েছেন তাদের সাথে বৃথা তর্ক করে লাভ নেই। আজ প্রয়োজন আমাদের ৯৯ ভাগের জন্য ষাট দশকের ৬ দফার মতো এ সময়ের পাল্টা রাজনৈতিক পরিকল্পনা হাজির করা। এর জন্য জনমত সংগঠিত করা। এ না করতে পারলে কোনো ধর্ম বা কোনো চেতনাই আমাদের রক্ষা করতে পারবে না।

(রাখাল রাহা, অক্টোবর ২০১৭)

Leave a Reply

Your email address will not be published.