আমরা কাছে আসতে পারি কিভাবে

আমরা কাছে আসতে পারি কিভাবে / রাখাল রাহা
.
আশির দশকের শেষের দিকে একেবারে গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেই প্রথম যে দুটো বিষয়ে আমার ভয়াবহ রকমের ধাক্কা লাগে তার একটা হচ্ছে সম্বোধন। একদিন বাংলাবাজারে গেছি এক প্রকাশকের কাছে। তিনি আমাকে ডাকলেন, রাখাল, শোনেন।

আমার গায়ে যেন বিদ্যুতের বাড়ি লাগলো। রাখাল ভাই বা রাখাল দা নয়, কিংবা নয় ‘শোনো’! নাম ধরে অথচ আপনি সম্বোধনে এভাবে যে ডাকা যায় তা আমার ধারণাতেও ছিল না।

আমরা কিশোর বয়সে বন্ধুদের ক্ষেপাতে অনেকসময় ঠিক এভাবেই ডাকতাম, ‘এই করিম, যাবেন?’, বা ‘করিম, আপনি যাবি?’ আমার ধাঁ করে সেটা মনে পড়েছিল। তিনি কি আমাকে ভ্যাঙাচ্ছেন? কিন্তু যিনি ডেকেছিলেন তিনি আমার চেয়ে বয়সে বড় ছিলেন এবং সেটাই ছিল তাঁর সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ। পরে বুঝেছিলাম, এটাই নাগরিক নিয়ম!

অনেক বছর এটা নিতে পারতাম না। গায়ে লাগতো। এর কারণ কি?

আমরা বাংলায় কারো সাথে প্রথম পরিচয়ের প্রাক্কালে সম্বোধন করার ক্ষেত্রে শুরুতে নাম বললেও তার সাথে বয়স বুঝে ‘ভাই’ বা ‘দাদা’ বা ‘আপা’ বা ‘দিদি’ ইত্যাদি যোগ করে নিই, এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে ‘আপনি’ বলি। বয়সের পার্থক্য খুব বেশী হলে কাকা, চাচা ইত্যাদি বলি। কেউ কেউ বয়স বিবেচনা করে সরাসরি নাম জিজ্ঞেস করেই ‘তুমি’তে নেমে যাই। অনেক সময় শুরুতে বলে নিই, ‘তুমি আমার চেয়ে ছোট, তুমি বললাম।’ সেখান থেকে সরে এই যে নাগরিক সম্বোধন, ‘করিম বা কারিমা শোনেন’—এটা আমাদের কি দিয়েছে?

একটা জিনিস প্রাথমিকভাবে আমরা পেয়েছি তা হচ্ছে, এভাবে নিজেকে একজন ব্যক্তি ভাবতে পারি। কিন্তু যা কেড়ে নিয়েছে তা হচ্ছে বন্ধন।
এটার থেকেই আমরা অনেকগুলো ধারাবাহিক নাগরিক ভড়ঙের জন্ম দিয়েছি। যেমন কেউ যখন বলে, ‘আসেন অমুকদিন’, আগে এর উত্তরে যেটা বলার রীতি ছিল তা হচ্ছে, ‘আচ্ছা যাবো’, বা ‘আচ্ছা দেখি পারলে যাবো’, বা ‘না একটু সমস্যা আছে ঐদিন’। কিন্তু এখন শেষেরটা, মানে ‘যেতে পারবো না’, এটা প্রায় নেই হয়ে গেছে। কেউ বললেই আমরা বলি, ‘যাবো’ বা ‘চেষ্টা করবো’। ‘যাবো’ বলেও যাই না, এবং ধরে নিই এটা জানানোর দরকার নেই। কারণ তিনি তো বুঝলেনই যে আমি গেলাম না। আবার তিনি যদি ফোন করেন বা দেখা হলে জিজ্ঞেস করেন, এটাকেও অনাগরিকসুলক আচরণ ভাবি। এই যে ‘যেতে পারবো না’, এটা না বলতে পারা—এটা আমাদের একে অপরের থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। অথচ মনে হয় যেন ‘যেতে পারবো না’ এটা বলা অসৌজন্যতা এবং এটা না-বলে আমরা দূরত্ব কমাচ্ছি! নাগরিক ভণ্ডামীর এমনই মুখোশ!

দ্বিতীয় যে-বিষয়টি আমাকে ভীষণ ধন্দে ফেলে দিতো তা হচ্ছে কোথাও কোনো বিষয় জানতে বা পেতে বা দিতে গেলে যখন বলা হতো, ‘এখন নয় পরে জানাবো’, তখন আমি সত্যিই ভাবতাম যে, পরে জানাবেন। কোনো খবর না পেয়ে আমি আবার যেতাম। এবং গিয়ে তাকে অপ্রস্তুত করে বোকা হয়ে ফিরে আসতাম।

এখনো বিষয়টায় আমি কনফিউজড হয়ে পড়ি। অনেকে লেখা চেয়ে লেখা পাঠালে লেখাটা পেলো কিনা তা জানায় না। এরপর না ছাপলে তো জানায়ই না, অনেক সময় ছাপলেও জানায় না। তার নাগরিক বিবেচনা কাজ করে যে, না পেলে তো আবার চাইতামই! আর ছাপিনি যখন তখন তো বুঝতেই পারছো ছাপবো না! আর লেখা দিয়ে ছাপা হলো কিনা তা তো তোমারই দেখার দায়িত্ব, এটুকু বুঝতে পারছো না কেন? এই যে ‘এটুকু’ নাগরিকেরা এখন বুঝতে পারছে—এটাতেও দূরত্ব বেড়ে যাচ্ছে।

তাহলে আমরা কি করতে পারি? আমার মনেহয় আমরা যেখানে ছিলাম সেখানে ফিরে যেতে পারি। এখানে যারা আমাকে বয়সে ছোট মনে করেন তারা নির্দ্বিধায় নাম ধরে রাখাল বা রাহা যেটা ইচ্ছে ডাকতে পারেন। তুমিতে ফিরতে পারেন। যদি একান্তই সংকট লাগে তবে সাথে ভাই বা দাদা একটাকিছু জুড়ে দিতে পারেন। আর এর সাথে আপনাকেও ওভাবে ডাকার সুযোগ দিন।

আসুন, চর্চাটা শুরু করি এটা মনে রেখে যে, মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠিত করলে তা সরাতেও সময় লাগে, অস্বস্তি লাগে প্রথমে। কারণ মিথ্যার মোহটা এমন যে একবার ধরে বসলে সত্যের সুবিধাটাও ভুলিয়ে দেয়।

আর একইসাথে আসুন ‘না’ বলতে শিখি। একটু ‘বেনাগরিক’ হই। অন্যে ‘বেনাগরিক’ হলে তাকে মর্যাদা দিই। নাগরিক ভণ্ডামী ঝেড়ে ফেলি। এতে দূরত্ব কমবে।

পরিশেষে যেটা গুরুত্বপূর্ণ—আমাদের সমস্ত সম্পর্ক, সমস্ত কাজের মধ্যেই ভক্তিধারাটা নেই হয়ে যাচ্ছে। তাই যুক্তিতে কাছাকাছি এসে বা এক হয়েও আমরা একে অপরের সাথে মিলতে পারি না। আমরা প্রতিদিন অভিন্ন লক্ষ্যে, অভিন্ন বক্তব্যে, অভিন্ন কাজে একে অপরের সাথে ফাঁক রেখে ঘুরিফিরি। তাই একটু ভিন্নমত দেখলেই ভক্তি না থাকায় ফাঁকটা যোজন দূরে চলে যায়। তখন খুব সহজেই আমরা একে অপরের সম্পর্কে শেষ মূল্যায়ন করে ফেলি।

এভাবেই আমাদের চিন্তা আজ এতটাই গোঁয়ার যে, যা নিয়ে চিন্তা, যা নিয়ে ভাবনা তার স্বার্থেও একটু শৈথিল্য প্রদর্শন করতে সম্মত হতে পারি না। আর আমাদের গোঁয়ার্তুমিতে যখন সেই বস্তুই হারিয়ে যাওয়ার যোগাড় হয় তখন মায়াকান্না কাঁদতে বসি।

আজ আমরা কেবল বস্তুগত স্বার্থেই এক হতে পারি। কিন্তু বস্তু দিয়ে মানুষের বেশীক্ষণ চলে না। ভক্তি-ভালবাসাটা চিরকালীন। এ দুটোকে সম্পদ করে তোলার উপরই আমাদের এ সময়ের মুক্তি। সকলের মঙ্গল হোক।
[রাখাল রাহা, মে ২০১৬]

Leave a Reply

Your email address will not be published.