দালালের মনোস্তত্ত্ব

দালালের মনোস্তত্ত্ব / রাখাল রাহা
.
দালাল বললেই বোঝা যায় তার একটা পক্ষ আছে। সে যদি স্বৈরাচার বা জালিম হয় তবে তার খুনখারাবী, লুটপাট বা জুলুম-অবিচার প্রক্রিয়ার সাথে যারা সরাসরি যুক্ত থাকে তাদের মনোস্তত্ত্ব, আর যারা পরোক্ষভাবে এর বস্তুগত-অবস্তুগত উপজাত প্রাপ্তি বা লাভালাভের সাথে যুক্ত থাকে তাদের মনোস্তত্ত্ব এক হয় না। প্রথম দল জালিমের সরাসরি সৈনিক আর দ্বিতীয় দল জালিমীর সুবিধাভোগী, দালাল। সে-কারণে সমালোচনা করলে প্রথম দলের প্রতিক্রিয়া, আর দ্বিতীয় দলের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন হয়।

সমালোচনা করলে দেখা যায় প্রথম পক্ষ, মানে জালিম ও তার বাহিনী, একটা পর্যায় পর্যন্ত রাগ-ক্ষোভ নিয়েও এগুলো উপেক্ষা করতে থাকে। কারণ তারা জানে, এগুলো তারা করছে এবং এগুলো তাদের করতে হবে। কিন্তু সমালোচনা তীব্র হলে, যেহেতু তার কাজের পক্ষে নিজের ভিতর থেকেই যুক্তি পায় না এবং সমালোচনায় জনরোষ সৃষ্টি হলে তার জালিমী অবসানের ভয় আছে, সে-কারণে তাদের পেশী ফুলে ওঠে। এবং এ পর্যায়ে তারা আঘাত করে। তারা আঘাত, হত্যা, গুম, ক্রসফায়ার, রিমা-, চোখ তুলে নেওয়া, ‘কুত্তা পেটানো’, হেলমেট-হাতুরী নামানো, ইত্যাদি আরো বহুকিছু করে।

কিন্তু পরোক্ষ ফলভোগী দালাল যারা তারা বেশ বুদ্ধিসুদ্ধিওয়ালা হয়। এরা জানে যে, সে যে ফল ভোগ করছে তা জালিমীর উপজাত। কিন্তু এটা প্রাপ্তির পক্ষে সে মনোস্তাত্ত্বিকভাবে অসহায় থাকে। তাই সমালোচনা শুনলেই সে তাকে উপেক্ষা করতে পারে না, তার গলা বা কলম ফুঁসে উঠতে চায়। কিন্তু যেহেতু জুলুমকে সে জুলুম হিসাবেই নিজের সাথে যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে বোঝে, তাই জুলুমের সমালোচনায় যুক্তি দিতে সে নিজের কাছে নিজেই পরাজিত হতে থাকে। এতে তার বুদ্ধিবৃত্তিকসত্তা ক্রমাগত আহত হতে থাকে। সে অস্থির হয় একদিকে উপজাত হারানোর, অন্যদিকে আবার জালিমের মতো পেশীশক্তির ব্যবহার করে ক্রোধ প্রশমনেও সে সক্ষম থাকে না। সে-কারণে পরিস্থিতির চাপে সে মাঝেই মাঝেই এমন এলোমেলো আচরণ করতে থাকে যা তার স্বাভাবিক বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার সাথে হয়ে ওঠে চরম বিরোধাত্মক ও বৈপরীত্যপূর্ণ। তাই অধিকাংশ সময় দেখা যায়, সে যে শিল্প-সাহিত্য-সঙ্গীত-সমাজ-অর্থনীতি-ধর্ম-দর্শন ইত্যাদি নিয়ে এ যাবত এতো এতো তাৎপর্যপূর্ণ কথা বলে এসেছে, সেগুলোর সাথে তার এই আচরণ মেলানো যাচ্ছে না।

কিন্তু এই বিরোধ আর বৈপরীত্য নিয়েও তাকে দালালীই অব্যাহত রাখতে হয়, কারণ অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার ফিরে আসার পথ ভিতর থেকে মানসিকভাবে এবং বাইরে থেকে সামাজিকভাবে অনেকটা বন্ধ হয়ে যায়। তাই সে অনেকসময় নিজেও স্বৈরাচার বা জালিমের সমালোচনায় অংশ নেয়। এবং এমনভাবে নেয়, যাতে তার সমালোচনা অপরাপর সমালোচনাকে আড়াল ক’রে বা সামনে আসতে না দিয়ে জালিমের চারপাশে ‘পবিত্র সমালোচনার’ একটা ব্যুহ নির্মাণ করে দেয়। সমালোচনাহীন অবস্থা থেকে এমত ‘পবিত্র সমালোচনা’ ব্যুহকে জালিম-স্বৈরাচার খুব নিরাপদ বোধ করে। ট্রাজেডী হচ্ছে, সে এই নিরাপদ পরিবেশে থেকে থেকে ক্রমশ চারপাশের প্রকৃত চিত্র বোঝার সক্ষমতাও একসময় হারিয়ে ফেলে।

এমন দালাল ও ‘পবিত্র সমালোচক’ শ্রেণী সকল কালে দুনিয়ার সব স্বৈরাচারের সাথেই থাকে। একাত্তরেও ছিল। এরাই স্বৈরাচারের সকল অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে গণতান্ত্রিক করার মোড়ক নির্মাণ করে, জনআয়নায় দুঃশাসনের কোমল-পেলব ছায়া ফেলে, ন্যায্য-গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে অন্যায্য-অগণতান্ত্রিক প্রমাণের তথ্য-উপাত্তের যোগান দেয়, এবং আরো বহুকিছু করে। এরাই শিক্ষায় ভ্যাট বিরোধী আন্দোলনের ন্যায্যতার বিপরীতে ‘মন পাবি দেহ পাবি’ ফেষ্টুন খুঁজে সামনে আনে, কোটা সংস্কার আন্দোলনের ক্রোধাত্মক-ব্যঙ্গ ‘আমি রাজাকার’ দেখে হড়হড়িয়ে বমির ফতোয়া দেয়, উই ওয়াণ্ট জাষ্টিস ম্যুভমেণ্টের জাষ্টিস ফেলে ‘পুলিশ কোন চ্যাটের বাল’-এর অশ্লীলতা আবিষ্কারের জন্য অপেক্ষা করে, এবং ধারাবাহিকভাবে তারা এরকম বহু কিছু করে চলে।

বাংলাদেশে এরাই আজ অনেকদিন ধরে অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দিয়ে অগণতান্ত্রিক শক্তির জুজু প্রতিরোধের ‘গণতান্ত্রিক’ ফরমূলা হাজির করে চলেছে! এরা বলছে, আপনি এই রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যেও মোটামুটি একটা গ্রহণযোগ্য বা ফেয়ার ইলেকশন চান মানেই আপনি অগণতান্ত্রিক শক্তিকে রাষ্ট্রক্ষমতায় দেখতে চান! বলছে, অগণতান্ত্রিক শক্তিকে অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দিয়ে রুখে দিয়েও একমাত্র এরাই গণতান্ত্রিক থাকতে পারেন, আর কেউ নয়! তারা যে পারেন, এর কারণ একাত্তরে যেমন এদেরই পূর্বসূরী রাজাকার-আলবদরদের কাছে ধর্মের মাজেজা ছিল, এখন তেমনি এদের বগলে রয়েছে চেতনার মাজেজা!

এরা কবি-শিল্পী-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিক-আইনজীবী-অধ্যাপক অনেককিছু। কিন্তু এরা এই সময়েরই এক-একজন রাজাকার-আলবদর। এ না হলে তারা বুঝতেন, অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দিয়ে অগণতান্ত্রিক শক্তির সাময়িক প্রতিরোধ দীর্ঘমেয়াদে, আবারো বলি দীর্ঘমেয়াদে, কোনো দেশ বা জাতির জন্য মঙ্গলজনক নয়।

বুঝতেন, এরা যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে, সেই মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্যতা ঘাড়ের উপর এনে ফেলেছিল ৭০-এর এলএফও-র কালাকানুনের মধ্যেও হওয়া একটা ফেয়ার ইলেকশন।

বুঝতেন, ২০০৮-এর যেই ফেয়ার ইলেকশনে সেদিন তাদের কথিত “সব শালা রাজাকার হয়ে গেছে” এমন মানুষের ভোটেই তারা নিরঙ্কুশ বিজয় নিয়ে এ পর্যন্ত এতো এতো ‘উন্নয়ন’ করলেন, আজ সেই নিরঙ্কুশ মানুষের প্রতি তাদের যে নিরঙ্কুশ অনাস্থা তার কারণ সেই মানুষের চেতনা-বিচ্যুতি নয়, তাদেরই জালিমী।

বুঝতেন, মানুষের সংগ্রামের অর্জন দীর্ঘমেয়াদে কখনো পশ্চাদগামী হয় না।

বুঝতেন, পাকিস্তান অর্জন ছিল বাংলাদেশ অর্জনেরই পূর্ববর্তী ধাপ, যা এই ভূভাগের মানুষেরাই সংগ্রাম করে অর্জন করেছিল।

বুঝতেন, এই লড়াকু জাতির ষাটের দশক, আশির দশকই ছিল সবচেয়ে গৌরবময়—সংগ্রামে, শিল্পে, সাহিত্যে, সঙ্গীতে, নাটকে, চিত্রকলায়, সর্বত্রে; এবং যাকে সে “উন্নয়ন” বলে, তথাকথিত সেই “উন্নয়নও” এই দুই দশকেই তুলনামূলকভাবে বেশী হয়েছিল।

ইসলামের নামে জুলুমের বটিকা ষাট দশকে এই ভূখণ্ডের মানুষ খায়নি, চেতনার নামে জুলুমের বটিকাও এখন সম্পূর্ণ অকার্যকর। এরা আজ বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পরাজিত, পতিত, দেউলিয়া। যে কোনো নতুন চিন্তা, কথা বা কাজই তাই আজ এদের কাছে ভীতির সমান।

এদের সতীর্থদের পরাজয়েই ৭১-এ বিজয় উড়েছিল। নতুন বিজয় নতুন প্রজন্ম আনবেই।

(রাখাল রাহা, অক্টোবর ২০১৮)

Leave a Reply

Your email address will not be published.