আমরা টিকে যাচ্ছি কিভাবে?

আমরা টিকে যাচ্ছি কিভাবে? / রাখাল রাহা
.
বাংলাদেশ একটা দেশ, যা ডেলটা বা বদ্বীপ ভূখণ্ডের একটি অংশ। বাংলাদেশী একটি জাতি, যারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রে বাস করে। দুটোর উপরই বহুমাত্রায় জাতীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। কিন্তু বিস্ময়করভাবে দেখা যাচ্ছে ভূখণ্ডগত এবং জাতিগত কোনোভাবেই এটা সেভাবে ভেঙে পড়ছে না! একভাবে চলতে পারছে। এর কারণ কি?


বাংলাদেশ পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বদ্বীপ গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের অংশ এবং এই বদ্বীপের গঠন প্রক্রিয়া এখনো চলমান। বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলো ভারতের মধ্য দিয়ে এসেছে এবং তার উৎস ভারত ও চীন। বাংলাদেশের উজানের প্রায় সকল নদীর উপর বহু বহু বাঁধ দিয়ে ও নালা করে ভারত পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে।

কিন্তু যেহেতু এই বদ্বীপের গঠনপ্রক্রিয়া এখনো চলমান, তাই এর গঠনের প্রধান কারিগর নদীগুলোর শুধু সারফেস কারেণ্ট না, এর একটা আণ্ডার কারেণ্ট বা পাতাল প্রবাহও আছে—যা আমরা সাধারণত দেখতে পাই না। পদ্মা সেতু করার সময় এই প্রথম আমরা সাধারণ মানুষও বিষয়টা বুঝতে পারি। তাই উজানে ভারত এতো এতো পানি প্রত্যাহার করে নিলেও ভাটিতে আমাদের পরিবেশ-প্রকৃতি এখনো যে টিকে আছে এবং বঙ্গ নামের উপসাগরে যে এখনো আমাদের ভূখণ্ড বেড়ে চলেছে তা মূলত এই আণ্ডার কারেণ্টের কারণে। সেটাই আমাদের ভূখণ্ডকে বাঁচিয়ে দিচ্ছে।


কিন্তু যেখানে রাষ্ট্র, সরকার, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তি সবাই মিলে এতো এতো বর্বরতা ও ধ্বংসপ্রবাহ পরিচালনা করছে, সেখানে আমরা জাতি টিকে যাচ্ছি কিভাবে? উপনিবেশ আমল থেকে আজ অবধি সবাই মিলে এতো যে পরিকল্পিত ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে গেল, তবু এটা ভেঙে পড়ছে না কেন? কেনই-বা এই জাতি ব্রিটিশ-আমেরিকান বা ইউরোপীয়দের মতো ভিতরে ভিতরে এখনো এতোটা শার্প ধূর্ত-বর্বর হতে পারেনি?

এর কারণ এই বদ্বীপ ভূখণ্ডের জাতিগঠনও এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। আমাদের নদীগুলোর মতো এরও সারফেস কারেণ্ট এবং আণ্ডার কারেণ্ট আছে। উপরের কারেণ্টে সবাই মিলে বহুভাবে ধ্বংসযজ্ঞ চালালেও এখনো এর অত্যন্ত শক্তিশালী আণ্ডার কারেণ্ট আছে।

তার একটা হলো ধর্ম, আধ্যত্ব ও প্রকৃতি নির্ভর সমাজ ও মানবতা বোধ, এবং আরেকটা হলো রাষ্ট্র ও সরকারের কর্তৃত্বের বাইরের বহু ধরণের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং উৎসব-পার্বণ। বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও এগুলো জাতির আত্মায় অন্তর্লীনভাবে বিশুদ্ধ বায়ুর যোগান দিয়ে চলেছে। সে কারণেই এতো এতো রাষ্ট্রীয় ধ্বংসযজ্ঞ চললেও জাতি ভেঙে পড়ছে না—চলছে। নানা উপলক্ষ্যে তার প্রাণস্পন্দন, আত্মার নিষ্কলুষ রূপ আমরা আজও দেখতে পাচ্ছি।


ভূখণ্ড ও জাতিগঠনের স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক ধারা তবে কিভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব? আসলে রাষ্ট্র ও সরকার কর্তৃক জাতি-ধ্বংসী প্রক্রিয়া থামানোটা সম্পূর্ণ রাজনীতির বিষয়। সেটা নিশ্চয়ই ঘটবে। আর এটা ঘটলেই কেবল ভূখণ্ডগতভাবে বাংলাদেশের প্রাণ-প্রকৃতি-পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য রক্ষা করার উপায় বের করাও সম্ভব হবে। তার আগ পর্যন্ত উভয়পাক্ষিক সমূহ ধ্বংস সামলে টিকে থাকার জন্য জাতি গঠনের আণ্ডার কারেণ্টকে শক্তিশালী করে যাওয়া ছাড়া আমাদের উপায় নাই।

(রাখাল রাহা, ২৩শে মার্চ ২০২২)

Leave a Reply

Your email address will not be published.